অসমের জোরহাটে বিমানবাহিনীর বিমানে ভয়াবহ দুর্ঘটনা: রানওয়েতেই দু'টুকরো AN-32, শহীদ ৫ জওয়ান
বদরুল ইসলাম, ১৩ জুন ,
আমার সোনার কালিগঞ্জ, শ্রীভূমি: শনিবার সকালে এক মর্মান্তিক ও ভয়াবহ দুর্ঘটনার সাক্ষী থাকল অসমের জোরহাট। জোরহাটের রোরৈয়া (Rowriah) বিমানবাহিনী ঘাঁটিতে অবতরণের ঠিক পরপরই দুর্ঘটনার কবলে পড়ে ভারতীয় বিমানবাহিনীর একটি ‘এএন-৩২’ (AN-32) মালবাহী বিমান। অবতরণের সময় রানওয়েতে চাকা ফেটে যাওয়ার জেরে বিমানটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ছিটকে পড়ে এবং মুহূর্তের মধ্যে এক তীব্র বিস্ফোরণে দু'টুকরো হয়ে যায়। এই ভয়ংকর দুর্ঘটনায় বিমানে থাকা পাঁচজন বীর বায়ুসেনা কর্মী ঘটনাস্থলেই শহীদ হয়েছেন। গুরুতর জখম হয়েছেন বিমানের সহ-পাইলট (Co-pilot)। এই ঘটনায় গোটা রাজ্য তথা দেশজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
![]() |
| ঘটনাস্থলের দৃশ্য |
বিমানবাহিনী সূত্রে জানা গেছে, শনিবার সকাল আনুমানিক ১০টা নাগাদ জোরহাটের রোরৈয়া এয়ারবেসে সাধারণ একটি উড্ডয়ন (Routine Sortie) শেষে অবতরণ করছিল বিমানটি। সবকিছু ঠিকঠাকই ছিল। কিন্তু রানওয়ে স্পর্শ করার ঠিক পরেই ঘটে এক চরম বিপর্যয়। প্রাথমিক অনুমান অনুযায়ী, ল্যান্ডিং করার সময় বিমানটির চাকা ফেটে যায়। গতি তীব্র থাকায় পাইলট বিমানটির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারেননি। রানওয়ে থেকে ছিটকে গিয়ে পাশের একটি নিচু জমিতে আছড়ে পড়ে বিশাল বিমানটি।
মাটিতে আছড়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিমানটির জ্বালানি ট্যাঙ্কে আগুন ধরে যায় এবং এক বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, শক্তিশালী সোভিয়েত আমলের তৈরি এই AN-32 বিমানটি মাঝখান থেকে ভেঙে দু'টুকরো হয়ে যায়। দূর-দূরান্ত থেকে আকাশে কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যেতে থাকে।
দুর্ঘটনার খবর পাওয়া মাত্রই জোরহাট রোরৈয়া ঘাঁটির দমকল বাহিনী, উদ্ধারকারী দল এবং সেনা চিকিৎসকেরা ঘটনাস্থলে ছুটে যান। দাউদাউ করে জ্বলতে থাকা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে বেশ বেগ পেতে হয় উদ্ধারকারীদের। বিমানটির পেছনের অংশটি উল্টে রয়েছে এবং ধ্বংসস্তূপের মাঝে সেনা কর্মীরা প্রাণপণ চেষ্টা চালাচ্ছেন আগুন নেভানোর ও ভেতরে আটকে থাকা স্বজনদের উদ্ধার করার।
বিমানের ভেতর থেকে অত্যন্ত আশঙ্কাজনক অবস্থায় সহ-পাইলটকে উদ্ধার করে সেনা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। বর্তমানে তিনি চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তবে অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, বাকি পাঁচজন ক্রু মেম্বারকে শেষ রক্ষা করা যায়নি। আগুনে পুড়ে এবং বিস্ফোরণের আঘাতেই ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় তাঁদের।
এই দুর্ঘটনায় ভারতীয় বিমানবাহিনী তাঁদের পাঁচজন দক্ষ ও সাহসী সেনানিকে হারাল। শহীদ জওয়ানদের নাম ঘোষণা করেছে বিমানবাহিনী। তাঁরা হলেন:
১. স্কোয়াড্রন লিডার প্রশান্ত সিং
২. ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট শুভম কুমার
৩. সার্জেন্ট জিতেন্দ্র শর্মা
৪. অগ্নিবীরবায়ু খেমারাম কুমাওয়াত
৫. অগ্নিবীরবায়ু দানিশ আলম
শহীদদের মধ্যে যেমন অভিজ্ঞ অফিসার ছিলেন, তেমনই ছিলেন দেশের সুরক্ষায় নতুন যোগ দেওয়া তরুণ অগ্নিবীর জওয়ানেরাও। কর্তব্যরত অবস্থায় দেশের জন্য তাঁদের এই আত্মত্যাগ দেশবাসী চিরকাল শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।
দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ খতিয়ে দেখতে ইতিমধ্যেই ভারতীয় বিমানবাহিনীর (IAF) সদর দফতর থেকে একটি উচ্চপর্যায়ের অভ্যন্তরীণ তদন্তের (Court of Inquiry) নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চাকা ফেটে যাওয়ার কারণেই এই বিপত্তি, নাকি এর পেছনে কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি বা অন্য কোনো কারণ ছিল, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখা হবে। ব্লাক বক্স উদ্ধার করে দুর্ঘটনার ঠিক আগের মুহূর্তের পাইলটের কথাবার্তা এবং বিমানের কারিগরি পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হবে বলে জানা গেছে।
এই মর্মান্তিক ঘটনার পর দেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং অসমের মুখ্যমন্ত্রী গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। শহীদ জওয়ানদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, "জোরহাটে বিমানবাহিনীর বিমান দুর্ঘটনার খবর অত্যন্ত বেদনাদায়ক। দেশের সুরক্ষায় প্রাণ উৎসর্গ করা পাঁচ বীর জওয়ানের আত্মার শান্তি কামনা করি এবং তাঁদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের পাশে আমরা রয়েছি।"
সেনাবাহিনীর বিমান দুর্ঘটনা সবসময়ই দেশের জন্য এক বড় ধাক্কা। বিশেষ করে AN-32 এর মতো নির্ভরযোগ্য বিমান, যা উত্তর-পূর্ব ভারতের পাহাড়ি ও দুর্গম এলাকায় যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম, তার এই পরিণতি নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে বিশেষজ্ঞদের। রোরৈয়া ঘাঁটির এই কালো শনিবারের স্মৃতি অসমের মানুষ হয়তো সহজে ভুলতে পারবেন না।

No comments: