রক্ষকই যখন ভক্ষক! পুলিশের নাম ভাঙিয়ে ১৪ লাখ টাকা তোলাবাজি, গ্রেফতার এসআই-সহ ৩
আমার সোনার কালিগঞ্জ, ১৭/০৮/২০২৬ :
আমাদের সমাজে পুলিশকে দেখা হয় সুরক্ষার প্রতীক হিসেবে। কিন্তু সেই পুলিশের পোশাকের আড়ালেই যদি লুকিয়ে থাকে অপরাধী কিন্তু সব নয়, তবে সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে? আসামের করিমগঞ্জ জেলার পাথারকান্দি থানায় ঘটেছে ঠিক তেমনই এক চাঞ্চল্যকর ও লজ্জাজনক ঘটনা। এক ব্যবসায়ীকে ভয় দেখিয়ে এবং পুলিশের নাম শুনিয়ে টানা ১৪ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছেন খোদ থানার সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) এবং দুই কনস্টেবল! ঘটনাটি জানাজানি হতেই পুরো পাতারকান্দি জুড়ে পুলিশ প্রশাসনের অভ্যন্তরে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।
![]() |
| ১৭-০৮-২০২৬ |
কী ঘটেছিল সেদিন?
ঘটনার সূত্রপাত ধর্মগঞ্জ স্টেশন থেকে। এক ব্যবসায়ী তাঁর ব্যবসার কিছু জরুরি কাজে নগদ মোটা অংকের টাকা নিয়ে ট্রাইন যোগে ত্রিপুরার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিলেন। কিন্তু ট্রেনটি যখন পাথারকান্দি স্টেশন অতিক্রম করছিল, তখনই ঘটে সেই ভয়ংকর ঘটনা। হঠাৎ করে ৫ জন ব্যক্তি ওই ব্যবসায়ীর সামনে এসে উপস্থিত হয় এবং নিজেদের 'পুলিশ' বলে পরিচয় দেয়। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা ওই ব্যবসায়ীকে ট্রেন থেকে নামিয়ে নেয় এবং একটি সাউন্ড-প্রুফ পুলিশি গাড়িতে তোলে। এরপর শুরু হয় মানসিকভাবে হেনস্তা ও ভয়ভীতি প্রদর্শন। বিভিন্ন ভুয়া মামলায় জড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে ব্যবসায়ীর কাছে থাকা নগদ ১৪ লাখ টাকা বলপূর্বক ছিনিয়ে নেয় ওই দলটি। টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পর তারা চম্পট দেয়।
গোপন তদন্তে থলে থেকে বেড়াল!
সর্বস্ব হারিয়ে ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী চুপ করে বসে থাকেননি। তিনি সাহস করে সঙ্গে সঙ্গে পুরো বিষয়টি লিখিতভাবে থানায় জানান। অভিযোগ পাওয়ার পর ঘটনার গুরুত্ব অনুভব করে পুলিশ প্রশাসন স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এক গোপন তদন্ত শুরু করে। আর সেই তদন্তেই বেরিয়ে আসে বিস্ফোরক সব তথ্য! দেখা যায়, কোনো বাইরের অপরাধী চক্র নয়—এই জঘন্য তোলাবাজির মূল ছকটি এঁকেছিলেন খোদ পাথারকান্দি থানারই সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) লাংথইবা সিংহ! আর এই কাজে তাঁকে সরাসরি সাহায্য করেছিলেন ওই একই থানার দুই কনস্টেবল—আনোয়ার হোসেন এবং সজল শুক্লবৈদ্য।
ঘটনার সত্যতা প্রমাণের পর অভিযুক্ত পুলিশকর্মীদের ধরে এনে কড়া জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করা হয়। পুলিশের জেরার মুখে তারা নিজেদের অপরাধের কথা স্বীকার করে নেয়।
এরপরই কালবিলম্ব না করে অভিযুক্ত এসআই লাংথইবা সিংহ এবং দুই কনস্টেবল আনোয়ার হোসেন ও সজল শুক্লবৈদ্যকে গ্রেফতার করা হয়। বর্তমানে পাথারকান্দি থানায় তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ধারায় মামলা দায়ের করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে এই অপকর্মের সাথে জড়িত ছিল আরও কয়েকজন। বাকি পলাতক অভিযুক্তদের ধরে জালে তুলতে পুলিশ বর্তমানে চিরুনি তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছে।
যেখানে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করা এবং সাধারণ মানুষের সম্পত্তি পাহারা দেওয়া পুলিশের দায়িত্ব, সেখানে খোদ পুলিশের এমন রূপ দেখে স্তম্ভিত পুরো এলাকা। প্রশাসনের ভিতরের লোকই যখন এভাবে অপরাধ চক্রের সাথে জড়িয়ে পড়ে, তখন সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার বিষয়টি বড়সড় প্রশ্নের মুখে এসে দাঁড়ায়।
তবে এই ঘটনার ইতিবাচক দিক হলো—অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশ বিভাগ নিজেদের সহকর্মীদের ছাড় না দিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছে এবং তাদের গ্রেফতার করেছে। সাধারণ মানুষের উদ্দেশ্যে একটাই কথা—কোনো পুলিশ বা অসাধু চক্র যদি আইনি ক্ষমতার অপব্যবহার করে টাকা দাবি করে, তবে ভয় না পেয়ে সঠিক জায়গায় অভিযোগ জানানো অত্যন্ত জরুরি, ঠিক যেমনটি এই সাহসী ব্যবসায়ী করেছিলেন।

No comments: