ইরান আর আমেরিকা : একদিন যুদ্ধবিরতি, পরদিনই আবার লড়াই—আসলে কী চলছে এদের মধ্যে?

ইরান আর আমেরিকা : একদিন যুদ্ধবিরতি, পরদিনই আবার লড়াই—আসলে কী চলছে এদের মধ্যে?

আমার সোনার কালিগঞ্জ, শ্রীভূমি: খবরের কাগজ খুললে বা মোবাইলের ইউটিউবে বা টিভির রিমোট টিপলেই মনে হয়, এরা যেন টম অ্যান্ড জেরি! একদিন শুনবেন দুপক্ষই শান্ত, হয়তো কোনো চুক্তি হচ্ছে বা যুদ্ধবিরতির (সিজফায়ার) কথা চলছে। আর ঠিক তার পরদিনই ব্রেকিং নিউজ—অমুক জায়গায় ড্রোন হামলা হয়েছে, অমুক জাহাজ আটকে দেওয়া হয়েছে, বা একে অপরকে হুমকি দিচ্ছে। এই যে "এক কদম আগে, দু কদম পিছে" চলার খেলা, এটা কেন হয়? আসুন একদম সহজ, ঘরোয়া ভাষায় ব্যাপারটা একটু খতিয়ে দেখা যাক।
02 JUN 2026



আমেরিকা আর ইরানের এই ঝগড়া কিন্তু আজকের বা কালকের নয়। এর ইতিহাস বেশ পুরোনো। সেই ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের পর থেকেই এদের মধ্যে দা-কুমড়ো সম্পর্ক। 
আসলে এদের মধ্যে সরাসরি মুখোমুখি যুদ্ধ খুব কমই হয়। যা হয়, তাকে বলে ‘প্রক্সি ওয়ার’ বা অন্যের কাঁধে বন্দুক রেখে লড়াই। ইরান সরাসরি আমেরিকার সাথে যুদ্ধ করতে যাবে না, কারণ শক্তির দিক থেকে আমেরিকা অনেক এগিয়ে। আবার আমেরিকাও সরাসরি ইরানের মাটিতে ঢুকে যুদ্ধ শুরু করতে চায় না, কারণ ইরাক বা আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা তাদের ভালো নয়। তাই লড়াইটা চলে একটু অন্যভাবে।

এখন প্রশ্ন হলো, এই যে রোজ রোজ খবরের মোড়ক বদলায়, এর পেছনে কারণটা কী? এর পেছনে মূলত তিনটি বড় কারণ আছে:

  1. আঞ্চলিক আধিপত্যের লড়াই (মিডল ইস্টের দাদা কে?): মধ্যপ্রাচ্যে বা মিডল ইস্টে নিজের দাপট বজায় রাখতে চায় ইরান। এর জন্য তারা লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি বা গাজার হামাসের মতো বিভিন্ন গ্রুপকে সমর্থন দেয়। আমেরিকা আবার তার পরম মিত্র ইসরায়েল আর সৌদি আরবকে বাঁচাতে এই গ্রুপগুলোকে রুখতে চায়। যখনই ইরান-সমর্থিত কোনো গ্রুপ মার্কিন ঘাঁটিতে বা ইসরায়েলে হামলা করে, অমনি আমেরিকা পালটা মার দেয়। তখনই শোনা যায় "যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন" হয়েছে।
  2. পর্দার পেছনের রাজনীতি আর কূটনীতি: যখনই পরিস্থিতি খুব খারাপ হয়, তখন দুপক্ষেরই মনে হয়—"না, যুদ্ধ হলে তো আমাদেরও ক্ষতি।" তখন মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো (যেমন কাতার বা ওমান) এসে টেবিলে বসে কথা পাড়ে। সাময়িক একটা যুদ্ধবিরতি বা উত্তেজনা কমানোর চুক্তি হয়। কাগজে-কলমে শান্তি ফিরে আসে।
  3. ঘরোয়া রাজনীতির চাপ: আমেরিকার প্রেসিডেন্টকে নিজের দেশের মানুষকে দেখাতে হয় যে তিনি ইরানের মতো দেশের সামনে মাথা নত করছেন না। আবার ইরানের নেতাদেরও নিজেদের জনগণের সামনে দেখাতে হয় তারা আমেরিকার 'সাম্রাজ্যবাদ'-এর কাছে হার মানছে না। এই ইগোর লড়াইয়ের চক্করে শান্তির চুক্তিগুলো বেশিদিন টেকে না। কেউ না কেউ উসকানি দিয়ে বসে, আর ব্যস—পরদিনই আবার অশান্তি!
সহজ কথায় বলতে গেলে, আমেরিকা আর ইরান—কেউই পুরোপুরি যুদ্ধ চায় না, আবার কেউই পুরোপুরি শান্তি চায় না।

একটি সহজ উদাহরণ: দুটো পাড়ার মোড়ের দুই মস্তান যেমন সারাক্ষণ একে অপরকে চোখ রাঙায়, কলার তোলে, কিন্তু জানে যে মারপিট করলে দুজনেরই মাথা ফাটবে। তাই তারা মাঝেমধ্যে চা দোকানে বসে শান্ত থাকার নাটক করে, আবার সুযোগ পেলেই একে অপরের বাইকের টায়ার লিক করে দেয়। এদের অবস্থাও ঠিক তাই।

আমেরিকা চায় ইরান যেন পারমাণবিক বোমা বানাতে না পারে এবং মধ্যপ্রাচ্যে দাদাগিরি বন্ধ করে। আর ইরান চায় আমেরিকা যেন তাদের ওপর থেকে সমস্ত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয় এবং তাদের স্বাধীনভাবে বাঁচতে দেয়। কিন্তু কেউই কাউকে বিশ্বাস করে না। এই 'অবিশ্বাসের দেওয়াল' যতদিন থাকবে, ততদিন খবরের কাগজে একদিন সিজফায়ার আর পরের দিন চুক্তি লঙ্ঘনের খবর আমরা শুনতেই থাকব। আজকের তারিখেও শোনা যাচ্ছে যে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে ইতিমধ্যেই মধ্যস্থতা হবে । 

আমাদের মতো সাধারণ মানুষের জন্য এই খবরগুলো একটা অসীমিত সিরিয়ালের মতো—যার ক্লাইম্যাক্স প্রতিদিন বদলায়

দেশ ও বিদেশের এ ধরনের খবর পেতে আমাদের ওয়েবসাইটের সাথে যুক্ত থাকুন ও ফলো বাটনে ক্লিক করুন।

No comments:

ইরান আর আমেরিকা : একদিন যুদ্ধবিরতি, পরদিনই আবার লড়াই—আসলে কী চলছে এদের মধ্যে?

ইরান আর আমেরিকা : একদিন যুদ্ধবিরতি, পরদিনই আবার লড়াই—আসলে কী চলছে এদের মধ্যে? আমার সোনার কালিগঞ্জ, শ্রীভূমি : খবরের কাগজ খুললে বা মোবাইলের ...

Powered by Blogger.